আবারো হুমকির মুখে রাজশাহী-ঢাকা রুটে বিমান চলাচল

ট্রাভেল নিউজ বিডিঃ রাজশাহীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রীসংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। উদ্বোধনের প্রথম মাস ঠিকঠাকভাবে চললেও ধীরে ধীরে যাত্রী সংখ্যা কমে এসেছে। ৭৪ আসনের বিপরীতে অনেকদিন অর্ধেক যাত্রীও মিলছে না বিমানে। এ অবস্থায় রাজশাহী থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ও রবিবার সকালে একটি করে ফ্লাইট চালু করার আবেদন জানিয়েছেন রাজশাহীর কর্মকর্তারা। বিমানের কর্মকর্তারা জানান, এভাবে চলতে থাকলে আবারো এই রুটে বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ বিমানের রাজশাহী বিক্রয় কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ৭ এপ্রিল উদ্বোধনের দিন ঢাকা থেকে ৬০ জন যাত্রী আসেন। আর রাজশাহী থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় উড়াল দেয় বিমান। ১০ এপ্রিল রাজশাহী থেকে ৩৮ জন ও ঢাকা থেকে ৬৯ জন, ১২ এপ্রিল রাজশাহী ৫৫ জন ও ঢাকা ৩৬ জন, ১৪ এপ্রিল রাজশাহী ৪০ জন ও ঢাকা ৩৬ জন, ১৬ এপ্রিল রাজশাহী ৭০ জন ও ঢাকা ৬৮ জন, ১৯ এপ্রিল রাজশাহী ৬২ জন ও ঢাকা ৪৬ জন, ২১ এপ্রিল রাজশাহী ৩৭ জন ও ঢাকা ৩৫ জন, ২৪ এপ্রিল রাজশাহী ৫৭ জন ও ঢাকা ৫৭ জন, ২৬ এপ্রিল রাজশাহী ৫২ জন ও ঢাকা ৩৮ জন, ২৮ এপ্রিল রাজশাহী ৪৪ জন ও ঢাকা ৫৯ জন, ০১ মে রাজশাহী ৫০ জন ও ঢাকা ৭৪ জন, ০৩ মে রাজশাহী ৭২ জন ও ঢাকা ৫৪ জন, ০৫ মে রাজশাহী ৩৯ জন ও ঢাকা ৩২ জন, ১০ মে রাজশাহী ২৪ জন ও ঢাকা ৪০ জন, ১৯ মে রাজশাহী ৩০ জন ও ঢাকা ৪৭ জন, ২২ মে রাজশাহী থেকে ৪১ জন ও ঢাকা থেকে ৬৬ জন যাত্রী নিয়ে রাজশাহীতে আসে। গত মে মাসে রাজশাহী থেকে ৬৪৮ জন ও ঢাকা থেকে ৭২৪ জন যাত্রী রাজশাহীতে আসেন। আর জুন মাসে ০৫ জুন রাজশাহী থেকে ৫২ জন ও ঢাকা থেকে ৫৪, ০৭ জুন রাজশাহী থেকে ৩৪ জন ও ঢাকা থেকে ৪৯ জন যাত্রী রাজশাহীতে আসেন। আর ০৯ জুন রাজশাহী থেকে ৩৯ জন ও ঢাকা থেকে ৩৮ জন, ১২ জুন রাজশাহী ২৬ জন ও ঢাকা ৪৪ জন এবং ১৪ জুন রাজশাহী ২৬ জন ও ঢাকা ৪৪ জন যাত্রী টিকিট বুকিং দিয়েছেন।

দীর্ঘ ৮ বছর বন্ধ থাকার পর গত এপ্রিল থেকে আবারো রাজশাহী-ঢাকা অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল শুরু করে। ৭ এপ্রিল রাজশাহী হযরত শাহ মখদুম বিমানবন্দরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন আনুষ্ঠানিকভাবে বিমান চলাচলের উদ্বোধন করেন। এর আগে বিমানবন্দরের টার্মিনাল স্থাপন, ফাইবার ফার্নিচার স্থাপন, সীমানাপ্রাচীর সম্প্রসারণ, পেট্রোল সড়ক ও রানওয়ে সংস্কারের কাজ শেষ করে রাজশাহী বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চালুর ফলে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা সহজেই রাজশাহী রুটের সঙ্গে আকাশ পথে সংযুক্ত হতে পেরেছেন। এতে বিমানের ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটনের প্রবৃদ্ধিও বাড়বে বলে আশাবাদী ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের সেই আশা ধীরে ধীরে ম্লান হতে চলেছে। কেননা কাঙ্ক্ষিত যাত্রী না পাওয়ায় বিমান আবারো লোকসানের দিকে যাচ্ছে। রাজশাহীতে বড় ধরনের কোনো শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠায় বিমানে যাতায়াতকারী যাত্রীর সংখ্যা খুবই কম। মূলত মন্ত্রী এমপি চিকিৎসক আর কিছু সংখ্যক বড় মাপের ব্যবসায়ী বিমানের যাত্রী। তবে বিমানের সময় কিছুটা পরিবর্তন আনলে যাত্রীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিমান রাজশাহী অফিসের সেলস প্রমোশন অফিসার এমএ হালিম তালুকদার জানান, বর্তমানে সপ্তাহে তিন দিন শুক্র, রবি ও মঙ্গলবার রাজশাহী-ঢাকা রুটে চলাচল করছে বিমানের ফ্লাইট। শুরুর দিকে কাঙ্ক্ষিত যাত্রী পাওয়া গেলেও ধীরে ধীরে তা কমে আসছে। কেননা রাজশাহীতে বিমানের যে ভাড়া তার তুলনায় অনেক কম ভাড়ায় স্বচ্ছন্দে এসি বাস অথবা ট্রেনের এসি কোচে ঢাকায় যাওয়া-আসা যায়। এসবের সময়সূচিও মানুষের চাহিদা অনুযায়ী।

তিনি বলেন, রাজশাহী-ঢাকা রুটে বিমান চালু হওয়ার পরপরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তাদের কাছে রাজশাহী থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ও রবিবার সকালে একটি করে ফ্লাইট দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। যেহেতু কাঙ্ক্ষিত যাত্রী মিলছে না, তাই রাজশাহী থেকে সৈয়দপুর হয়ে ঢাকা যাওয়ার একটি ফ্লাইট দেওয়ারও আবেদন জানানো হয়। কিন্তু এসব আবেদনে এখনও কোনো সাড়া মেলেনি।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক সেকেন্দার আলী জানান, গত ৭ এপ্রিল রাজশাহীতে বিমানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিনই মন্ত্রীকে সময় পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছিল রাজশাহী চেম্বারের পক্ষ থেকে। সপ্তাহে তিনদিন বিকেলের পরিবর্তে দুইদিন সকালে করা প্রয়োজন। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার বিকেলে ও রবিবার সকালে করা দরকার। এছাড়াও বিমানের টিকিট পাওয়া নিয়েও নানা সমস্যা হয়।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, লাভজনক অবস্থানে যেতে ও জনগণের স্বার্থে অবশ্যই বিমানের সময়সূচি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। নয়তো আবারো আগের মতো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই ভাবতে হবে।

রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, খুব শিগগিরই রাজশাহী বিমানবন্দরে বেসরকারি একটি এয়ারলাইন্স রাজশাহী-ঢাকা রুটে চলাচল শুরু করবে। এজন্য তারা রাজশাহী বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়ে চিঠিও দিয়েছেন। ওই বিমানটি চলাচল শুরু হলে যাত্রীদের শিডিউল নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকবে না।

এছাড়াও রাজশাহীবাসীর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমানের সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা।

রাজশাহীর নওহাটায় ১৬২ একর জমির ওপর ১৯৮৪ সালে হযরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত রাজশাহী শাহ মখদুম বিমানবন্দর ছিল লাভজনক অবস্থানে। এক পর্যায়ে মাত্র ২ জন যাত্রী নিয়েও বিমান উড়েছে এই বিমানবন্দর থেকে। মূলত মন্ত্রী এমপি আর কিছুসংখ্যক বড় মাপের ব্যবসায়িই ছিলো বিমানের যাত্রী। তবে সময়মত বিমান যাতায়াত না করা এবং দুপুরে বিমান চলাচলের সময় নির্ধারিত হওয়ায় যাত্রীরা বিমানে যাতায়াতে আগ্রহ হারায়। এক পর্যায়ে বিমানে মালামাল বুকিংয়ের পরিমাণও কমতে থাকে। এই রুগ্ন দশা চলতে চলতে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কর্তৃপক্ষ এই রুটে বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। তবে ২০১০ সালে গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমী ও ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমী নামে দুটি প্রতিষ্ঠান বৈমানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে বিমানবন্দরটিতে। এর আগে ২০১১ সালে সপ্তাহে দুদিন শনি ও বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে সৈয়দপুর হয়ে রাজশাহী পৌঁছায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের দুটি বিমান। তবে সেটিও নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল রাজশাহী-ঢাকা রুটে বাংলাদেশ বিমানের দুটি ফ্লাইট চালু করে বাংলাদেশ বিমান।