চার দেশে গাড়ী চলাচলে চুক্তি হচ্ছে সোমবার

বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের রূপরেখা চুক্তি হচ্ছে আগামী সোমবার। ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে চার দেশের পরিবহনমন্ত্রীরা এই চুক্তিতে সই করবেন।

গতকাল শুক্রবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে একটি দল ভুটানে গেছে। গত সোমবার বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় রূপরেখা চুক্তিটি অনুমোদন হয়েছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রূপরেখা চুক্তির পর কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে চলতি বছরের শেষের দিকে মূল চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে চলাচলের পথের সমীক্ষা, পরীক্ষামূলক চলাচল ও অভিবাসন-সুবিধা পর্যালোচনা করা হবে। আগামী বছরের শুরুতে চার দেশের মধ্যে যান চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

চুক্তির অধীনে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-লরি ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি চলতে পারবে। শুল্ক ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে নিজ নিজ দেশের আইনে। তবে ট্রানজিট ও চলাচলের অনুমতি-সংক্রান্ত ফি নির্ধারণ আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হবে।

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক (সাসেক) কৌশলগত বাণিজ্য সম্প্রসারণ রূপরেখার ওপর ভিত্তি করেই এ চুক্তি সই হচ্ছে। সাসেক রূপরেখা ২০১৪ সালের মার্চে এই চার দেশ অনুমোদন করে।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহনসচিব এম এ এন সিদ্দিক বলেন, শুধু স্থলবন্দর দিয়েই এই যাতায়াত হবে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো বন্দর নির্মিত হলে সেটিও চুক্তির আওতায় আসবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করছে। নতুন চুক্তি হলে এক দেশ অন্য দেশের ভূমি ব্যবহার করে তৃতীয় দেশেও যেতে পারবে। অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে চুক্তিটা করা হচ্ছে।

খসড়া রূপরেখা চুক্তি অনুসারে যানবাহনের বৈধ মালিকানা, ফিটনেস ও ইনস্যুরেন্সের হালনাগাদ দলিল থাকতে হবে। চালকের স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক যেকোনো এক ধরনের লাইসেন্স থাকলেই চলবে। আর যাত্রীর থাকতে হবে বৈধ ভ্রমণ দলিল। প্রয়োজন হলে পথে যেকোনো দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ যানবাহন পরিদর্শন করতে পারবে।

নিষিদ্ধ কিংবা তালিকাভুক্ত স্পর্শকাতর মালামাল বহন করা যাবে না। ব্যক্তিগত, যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের অনুমতি পাওয়ার জন্য আলাদা আলাদা ফরম পূরণ করতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত যানের দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন লাগবে। আর ব্যক্তিগত গাড়ির অনুমতি হবে সাময়িক এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দিতে পারবে।

 যানবাহন চলাচলের পথ: বাংলাদেশে এখন ২০টি স্থলবন্দর রয়েছে। এর ১৯টিই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। টেকনাফ বন্দরটি মিয়ানমারের সঙ্গে। বিদ্যমান সব বন্দর দিয়েই বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে। তবে বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানে যাওয়া-আসার জন্য প্রাথমিকভাবে দুটি করে চারটি পথ ঠিক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে নেপালে যেতে ঢাকা-বাংলাবান্ধা-জলপাইগুড়ি-কাকরভিটা এবং ঢাকা-বুড়িমারী-চেংরাবান্দা—এ দুটি পথ ব্যবহার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আর ভুটানের পথ দুটি হচ্ছে ঢাকা-বুড়িমারী-চেংরাবান্দা এবং অন্যটি ঢাকা-সিলেট-শিলং-গুয়াহাটি। সম্প্রতি ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি পথে যে বাস চালু করা হয়েছে, সেটি দিয়ে ইতিমধ্যে কয়েকজন ভুটানি ভ্রমণ করেছেন।

সূত্র জানায়, চুক্তিতে যাত্রীবাহী যানবাহন বলতে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বাস, ভাড়ায় চালিত বাস-কার ও ব্যক্তিগত গাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর পণ্যবাহী যানের মধ্যে রয়েছে কনটেইনার বহন করা যায় এমন ট্রেইলর ও ট্রাক।

কোন যান কীভাবে চলবে: ব্যক্তিগত গাড়ি অনিয়মিত যান হিসেবে বিবেচিত হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যাঁরা যেতে চান, তাঁদের ৩০ দিন পর্যন্ত ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হবে। যাত্রার যেসব উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে পর্যটন, তীর্থযাত্রা, বিয়ে অনুষ্ঠান, চিকিৎসা, শিক্ষা সফর, রেলস্টেশনে যাওয়ার জন্য যাত্রা।

এ ধরনের যাত্রীদের যাত্রাকালে জ্বালানি ভরে যেতে হবে। কোনো শুল্ক না দিয়েই নিতে পারবেন প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ। পথে জ্বালানির দরকার হলে ভর্তুকিবিহীন দামে জ্বালানি নিতে পারবেন। দুর্ঘটনায় পড়লে নিজ নিজ দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই গাড়ি নিয়ে যতবার ভ্রমণ করবেন, ততবার অনুমোদন নিতে হবে।

নতুন সদস্য, পুরোনোদের বেরিয়ে যাওয়া: খসড়া রূপরেখা চুক্তিতে বলা হয়েছে, উল্লেখিত চার দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশ চাইলে এই অবাধ যান চলাচল প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে। তবে চার দেশের কেউ দ্বিমত করলে অন্তর্ভুক্তি আটকে যাবে।

চুক্তিতে সই করা কোনো দেশ এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে অন্যদের লিখিতভাবে জানাতে হবে। এরপর চার দেশের পরিবহনসচিবেরা ৩০ দিনের মধ্যে আলোচনায় বসে পরবর্তী করণীয় ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবেন। চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার লিখিত আবেদন বাকি তিন দেশের হাতে পৌঁছানোর দিন থেকে পরবর্তী ছয় মাস পর তা কার্যকর হবে।

বাণিজ্যিক যানের রং: চুক্তিতে বলা হয়েছে, যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনগুলো হবে সাদা রঙের। দুই পাশে হলুদ রং দিয়ে ইংরেজি এবং নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিবহনের নাম, দেশের নাম, যাত্রা শুরু ও শেষের স্থানের নাম এবং পথ লেখা থাকবে।