পর্যটন বর্ষ-২০১৬কে সামনে রেখে বীচ কার্নিভাল উৎসব শুরু

ইংরেজি বছরের শেষ সূর্যাস্তকে বিদায় জানাতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বসে লক্ষাধিক মানুষের মিলনমেলা। পর্যটকদের ভিড়ে রাস্তাঘাটে দেখা দেয় মারাত্মক যানজট। প্রতিবছর থার্টিফার্স্ট উপলক্ষে কক্সবাজার সৈকতে লক্ষাধিক মানুষের মিলনমেলা ঘটলেও এবার রাতের অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ বছর উম্মাদনা ছিল অনেকটা কম। তবে এ উপলক্ষে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণে সৈকতের লাবণী পয়েন্ট ও সুগন্ধা পয়েন্টে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে ৩দিন ব্যাপী ‘বীচ কার্নিভাল’ উৎসব। গতকাল সকাল ১১টায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এই উৎসবের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে পর্যটন মন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবছর ইংরেজি বছরের শেষ দিন বিকালে ও মধ্যরাতে কক্সবাজার সৈকতে বসে লক্ষাধিক মানুষের মিলন মেলা। বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন সৈকতে ও হোটেলে আয়োজন করে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণে রমরমা উৎসব। তবে এবছর নিরাপত্তাহীনতার আশংকায় প্রশাসন রাতের অনুষ্ঠানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় উৎসবে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কিন্তু বিনোদনপিয়াসী পর্যটকরা যাতে মলিন বদনে না ফিরে তার জন্য আয়োজন রাখা হয়েছে ৩দিন ব্যাপী ‘বীচ কার্নিভাল’ উৎসবের।

জানা যায়, থার্টিফার্স্ট উপলক্ষে গতকাল শহরের চার শতাধিক হোটেলের প্রায় সকল কক্ষ অতিথিপূর্ণ ছিল। এসব হোটেলে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ পর্যটক অবস্থান করতে পারে বলে জানান হোটেল মোটেল জোন হোটেল মালিক সমিতির সহসভাপতি নুরুল আবছার।

তিনি জানান, গতকাল সমুদ্র সৈকতে লক্ষাধিক পর্যটক ছাড়াও জেলার অন্যান্য অঞ্চল থেকেও একই সংখ্যক মানুষ বেড়াতে আসেন।

ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টোয়াক বাংলাদেশ) সভাপতি রেজাউল করিম জানান, প্রতিবছর দুই ঈদের বন্ধ ছাড়াও থার্টি ফার্স্ট উৎসবে কক্সবাজারের হোটেল মোটেল সমূহের কোন কক্ষ খালি থাকে না। এমনকি প্রতিবছর কক্সবাজারে হোটেলের সংখ্যা বাড়লেও এসব দিনে কোন কক্ষ খালি যায় না। এবারের পরিস্থিতিও আগের মতোই।

ট্যুর অপারেটররা জানান, হোটেল কক্ষের সংস্থান করতে না পেরে অনেক আগ্রহী তরুণতরুণী এবার কক্সবাজারে বেড়াতে আসতে পারেননি। তবে অনেকেই দিনে এসে দিনে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কক্সবাজারে আসেন। আবার অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটানোর অভিপ্রায়েও কক্সবাজারে আসেন। তবে রাতের অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবার থার্টিফার্স্টের উন্মাদনা কম বলে জানান হোটেল মালিকরা।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, এবারের বর্ষবরণ উৎসবকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য ৩দিনের বীচ কার্নিভাল উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এ উৎসব উপভোগ করতে রেকর্ড সংখ্যক পর্যটক কক্সবাজারে এসেছেন। এ বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। গ্রহণ করা হয়েছে নি্নিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

জানা যায়, বর্ষবরণ উপলক্ষে গতকাল থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী পয়েন্ট ও সুগন্ধা পয়েন্টে জমকালো ‘মেগা বীচ কার্নিভাল’ এর আয়োজন করা হয়। পর্যটন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, ট্যুরিজম বোর্ড ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি আয়োজিত এই বীচ কার্নিভালের। ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী ‘গ্রে এডভারটাইজিং বাংলাদেশ লিমিটেড। কার্নিভালে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ মোট ৬৯টি ইভেন্ট। এ উপলক্ষে গতকাল সকাল দশটায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে র‌্যালি শুরু হয়ে সমুদ্র সৈকতের লাবণী পয়েন্টে পৌঁছে শেষ হয়। র‌্যালীতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, আশেক উল্লাহ রফিক এমপি, মোহাম্মদ ইলিয়াছ এমপি, পর্যটন সচিব খোরশেদ আলম, জেলা পরিষদ প্রশাসক মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনসহ সংশিহ্মষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। পরে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে ‘মেগা বীচ কার্নিভাল ডেস্টিনেশন২০১৫’ এর উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী। কার্নিভালের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৬৫ হাজার টাকা। এরমধ্যে জেলা প্রশাসন ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি দিচ্ছে ১ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং চুক্তিবদ্ধ বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘গ্রে’ দিচ্ছে ৩ কোটি টাকা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত পর্যটন বর্ষ২০১৬কে সামনে রেখে দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত বীচ কার্নিভাল এর আয়োজন করা হয়। উদ্বোধনী দিনের বর্ণাঢ্য র‌্যালীতে শহরের অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকশিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়ে অংশ গ্রহণ করে। এ ছাড়া পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, হোটেল মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন অংশ গ্রহণ করে। এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে শহরজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরী হয়েছে। কড়া নিরাপত্তার মাঝে অনুষ্ঠানরত মেগা বীচ কার্নিভালের প্রথমদিন গতকাল সৈকতের লাবণী পয়েন্টে ডিসপ্লে, সুগন্ধা পয়েন্টে ফুটবল, ভলিবল ও ক্রিকেট, দুপুরে ক্রিকেট ম্যাচ (), বালু ভাস্কর্য, . জাফর ইকবালের নেতৃত্বে ঘুড়ি উৎসব, মাইক্রোলাইট এয়ারক্রাফ্‌ট, ফুটবল ম্যাচ ও কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী বলিখেলা অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে সুগন্ধা পয়েন্টে অনুষ্ঠিত হয় মহিলা ও পুরুষদের ঘুড়ি উৎসব, ফুটবল ম্যাচ, প্যারালাইসিং, ডিজে শো, ফানুস উত্তোলন, জর্বিং, লাবণী পয়েন্টে অনুষ্ঠিত হয় ব্যান্ড সঙ্গীত। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ঢাকা ব্যান্ডের মাকসুদ নগরবাউল জেমস, কিরণ চন্দ্র রয় ও চন্দনা মজুমদার।

সুত্র জানায়, ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কক্সবাজারকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে চালু করেছিলেন। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান মালার মধ্য দিয়ে ৬০ বছর পূর্তি পালন করছে জেলাবাসী।