৬৯৯ ট্যুরিস্ট পুলিশ সাত শতাধিক পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তায়

আনুমানিক ৬০ লাখ পর্যটক আসা যাওয়া করে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরো ৬৯৪ জন পুলিশ সদস্যের চাহিদাপত্র দেয়া হয় সদর দপ্তরে। সেখান থেকে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র হয়ে বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আটকা রয়েছে চাহিদাপত্রটি। রাজধানীসহ সারাদেশের ৭ শতাধিক পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় রয়েছেন ৬৯৯ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ। এদের মধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ করেন মাত্র সাড়ে ৫০০ জন। ট্যুরিস্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য মতে, প্রয়োজনের তুলনায় অল্পসংখ্যক জনবল ও যানবাহন দিয়ে দেশি-বিদেশি ৬০ লাখ পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এ অবস্থায় নতুন ৬৯৪ জন পুলিশ সদস্যের চাহিদাপত্র দেয়া হলেও তা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে আটকে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যটন কর্পোরেশন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
tourist-police

ট্যুরিস্ট পুলিশ

জানতে চাইলে ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার (এডমিন ও ফিন্যান্স) সরদার নুরুল আমিন বলেন, দেশি ও বিদেশি সব পর্যটকের (পর্যটন স্থানে) নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ট্যুরিস্ট পুলিশের। তবে বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় একটু বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহন সংকটের কারণে বর্তমান কয়েকটি স্থানে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে। এর মধ্যে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেটের জাফলং, বিছানাকান্দি মাধবকু-, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সোনারগাঁও জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ও জাতীয় চিড়িয়াখানা রয়েছে। এছাড়া সুন্দরবন, রাজশাহী, বাগেরহাট, বান্দরবান, রাঙামাটি, দিনাজপুর, টুঙ্গিপাড়া, বগুড়াসহ আরো একাধিক স্থানে কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহন সংকটের কারণে এসব স্থানে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি জানান, দেশে বর্তমান ৭ শতাধিক পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব স্থানে বছরে দেশি-বিদেশি আনুমানিক ৬০ লাখ পর্যটক আসা যাওয়া করে। এর মধ্যে শতাধিক স্থানে বিদেশি পর্যটকের ভিড় দেখা যায়। এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরো ৬৯৪ জন পুলিশ সদস্যের চাহিদাপত্র দেয়া হয় সদর দপ্তরে। সেখান থেকে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র হয়ে বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আটকা রয়েছে চাহিদাপত্রটি। আসা করা যাচ্ছে আগামী জানুয়ারি মাসেই ওই মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। এর পরপরই এসব স্থানে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশে ট্যুরিস্ট পুলিশের যাত্রা শুরু হয়। পর্যটন কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে পুলিশের নবগঠিত এই ইউনিট। প্রথম অবস্থায় একজন ডিআইজি ও এডিশনাল ডিআইজি, ৪ এসপি, ৮ জন এডিশনাল এসপি ও ১১ সহকারী পুলিশ সুপার, ২১ জন ইন্সপেক্টরসহ ৬৯৯ জন পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়। প্রথমে পুলিশ সদর দপ্তরের মাত্র দুটি রুম নিয়ে কাজ শুরু করলে পরে রামপুরায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সদর দপ্তর গড়ে তোলা হয়। সেখানে ঢাকা ডিভিশনের কার্যালয়, ঢাকা জোনের কার্যালয়, ফোর্স ব্যারাক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরবর্তীতে কক্সবাজার, টেকনাফ, কুয়াকাটা, সিলেটের জাফলং, বিছানাকান্দি মাধবকু- লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সোনারগাঁও জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ও জাতীয় চিড়িয়াখানায় দায়িত্ব পালন শুরু করে ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্যরা। এছাড়া হাতিরঝিলেও মাঝেমধ্যে টহল দেয় তারা। এসব এলাকায় দায়িত্ব পালন ও কর্মকর্তাদের জন্য মাত্র ২৪টি স্থল ও জলজ যানবাহন ও ২১টি মোটরসাইকেল রয়েছে। ২৪ যানবাহনের মধ্যে ৭টি জিপ, ৭টি ডাবল কেবিন পিকআপ ভ্যান, একটি ট্যুরিস্ট পরিবহনের বাস, মালামাল পরিবহনের জন্য ২টি ট্রাক, ৩টি স্পিডবোট ও ৪টি ওয়াটারবাস রয়েছে। এসব যানবাহন দিয়ে সুমদ্র সৈকতে টহল দেয়া সম্ভব হয় না। সৈকতে বালু এলাকায় টহলের জন্য দরকার ৪ চাকার মোটর রাইডার।
সম্প্রতি এ ধরনের ৩৫টি যানবাহনের চাহিদাপত্র পাঠানো হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। এর মধ্যে ১৪টি যানবাহন অনুমোদন পায়। এসব যানবাহন ক্রয় প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণার পর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এ কারণে পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে ৭ শতাধিক জনবল ও বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাহিদাপত্র পাঠানো হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। পরে সেটি প্রস্তাব আকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে যাচাইবাছাইয়ের পর তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বর্তমান সেখানেই ফাইলটি আটকা রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার কারণে সেখান থেকে দ্রুতই ফাইটি পুলিশ সদর দপ্তরে চলে আসবে। চাহিদার এই জনবল হাতে পাওয়ার পর চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত ট্যুরিস্ট পুলিশ।
জানা গেছে, দেশের পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্রগুলো পর্যটন কর্পোরেশন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নির্ধারণ করে থাকে। দুই সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্য মতে দেশে বর্তমানে ৮ শতাধিক পর্যটন আকর্ষণ স্থান রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আফরোজা খান মিতা যায়যায়দিনকে বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হিসাব মতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এক হাজারের উপরে প্রত্ননিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৮টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব স্থানে সবসময়ই পর্যটকদের আসা-যাওয়া রয়েছে। তবে ১৯টি জাদুঘরসহ প্রায় শতাধিক প্রত্ননিদর্শন এলাকায় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা বেশি দেখা যায়। কিছু কিছু স্থানে টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব স্থানে আগত বিদেশিরা আসার আগে তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইনফর্ম করলে তা ট্যুরিস্ট পুলিশকে জানানো হয়। তারা সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে কিছু এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশ না থাকায় সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সাহায্যে নেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হিসাব মতে, সারা দেশে ৭ শতাধিকের উপরে পর্যটন আকর্ষণ স্থান রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ২০টির মতো রয়েছে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অধিক জনপ্রিয়। এছাড়া আরো অনেক স্থানেও বিদেশিরা আসা-যাওয়া করে। শুধু কক্সবাজারে প্রতি বছর ১৫ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ ৬০ লাখ পর্যটকের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের বাড়ানো জরুরি। পর্যটন যেহেতু একটি বহুমাত্রিক শিল্প, এর পরিধি এবং বিস্তারও বেশি। চীনের এক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, পর্যটন শিল্পের সঙ্গে প্রায় ৮০টি সেক্টর জড়িত। পর্যটন শিল্প যেহেতু একটি দেশের ব্যাপক কর্মসংস্থান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে পর্যটন খাতে ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন শিল্পে নবগঠিত ট্যুরিস্ট পুলিশ জরুরি ভিত্তিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মধ্যে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, প্রত্ন সম্পদ চুরি রোধ করা, পর্যটন আকর্ষণীয় এলাকায় ইভ টিজিং, বখাটে ও সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিহত করা, সাদা পোশাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পাহাড়ি ও সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করা; সংরক্ষিত পর্যটন অঞ্চলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা, হরতাল-অবরোধে পর্যটকবাহী গাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জানতে চাইলে ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার (এডমিন ও ফিন্যান্স) সরদার নুরুল আমিন জানান, পর্যটন কেন্দ্রের আশপাশে বখাটেদের তৎপরতা সবসময় দেখা যায়। সামাজিক সচেতনতা গড়ে উঠলে এর তৎপতা অনেক কমে যাবে। তবে ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকা- চোখে পড়লে বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকরা কোনো ধরনের সাহায্যে চাওয়ামাত্রই তা সমাধান করা হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য নষ্টকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তথ্য সুত্র -যায়যায়দিন